|
এক. সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলা একটি প্রাচীন জনপদ। বি¯তৃত ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অধিকারি এ উপজেলায় প্রাচীনকাল থেকে সভ্য মানুষের বিচরন ছিল। হজরত শাহজালাল (রঃ) এর ৩৬০ আউলিয়ার অনেক সাথীসহ বহু পীর ফকির ও বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক শ্রী চৈতন্য দেব মহা প্রভূর স্মৃতি বিজড়িত ধনধান্যে মৎস্যে ভরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি সারি সারি বনরাজি,পাহাড় পর্বত পরিবেষ্ঠিত বিল ঝিল, হাওর, ছড়া, ঝর্ণা ও নদ-নদী বিধৌত সুন্দর ও মনোরম স্থানের নাম হচ্ছে গোলাপগঞ্জ উপজেলা। নানা বর্ণ ও গন্ধময় গোলাপের মতই এর সৌরভ দেশ দেশান্তরে। প্রাচীন গৌড় রাজ্যের অন্তর্গত সিলেটের পূর্ব দক্ষিনে অবস্তিত গোলাপগঞ্জ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সামন্ত রাজ্যে বিভক্ত ছিল। পাঠান সম্রাট শের শাহের রাজত্বকালে ১৫৪০ সালে গোলাবরায় নামে একজন নতুন দেওয়ান স্থানীয় রাজস্ব কর্মকর্তা হিসাবে অবস্থান করতেন। দিল্লি সম্রাটের প্রতিনিধি গোলাবায়ের নামানুসারে গোলাবগঞ্জ নামের সৃষ্ঠি হয়। পরবর্তীতে লোখ মুখে ‘গোলাবগঞ্জ’ থেকে গোলাপগঞ্জ নামে পরিচিতি লাভ করে। একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা অতীতের ‘গোলাবগঞ্জ’ আর আজকের ‘গোলাপগঞ্জ’ এর মধ্যে প্রচন্ড ব্যবধান বিদ্যমান। (মুখবন্ধ: ক’জন কৃতিসন্তান - আনোয়ার শাহজাহান)
দুই. ১১৯০ সালের শেষের দিকে গোলাপগঞ্জের পূর্ণ পরিচিতি নিয়ে ‘গোলাপগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ গ্রন্থকারের প্রকাশের চিন্তা ভাবনা শুরু করি। কিন্তু কাজটি যে এত দুরূহ, কষ্ঠসাধ্য এবং ব্যয়সাপেক্ষ তা আমার জানা ছিল না। গোলাপগঞ্জের ইতিহাস বইর তথ্য সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে গিয়ে দেখেছি গোলাপগঞ্জের ইতিহাসের পরিধি অত্যন্ত বিশাল। কিন্তু নির্মম হলেও সত্য যে এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর অতীত ইতিহাস ধরে রাখার কোন প্রচেষ্ঠা নেয়া হয়নি কোন কালে, এমন কি বর্তমান কালেও। ফলে সঙ্গত কারনেই এর অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্য আজ লুপ্তপ্রায় এবং বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রবীনদের স্মৃতি চারনের ক্ষেত্রমাত্র এবং তা থেকে তত্ত্ব ও তথ্য সীমাবদ্ধ। এই সীমাবদ্ধতা নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে বিভিন্ন পেশাজীবী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং তথ্য বিষয়ক গ্রন্থ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকি। এ তথ্য সংগ্রহে গ্রামের দিন মজুর থেকে প্রসাদের আমলাদের কাছে যেতে হয়েছে। ঘুরতে হয়েছে অনেক অফিস আদালত, সাক্ষাত হয়েছে বিশিষ্ট ইতিহাস গবেষকদের সাথে। দু’একজন সহযোগিতা না করলেও অন্যরা সবাই প্রেরণা দিয়েছেন, সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছেন। তাঁদের সহযোগিতায় ‘গোলাপগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ গ্রন্থকারে রচিত হয়ে পাঠক পাঠিকাদের করকমলে নিবেদন করতে পারব এই দৃঢ় মনোবল সবসময় হৃদয়ের প্রতিটি সত্ত্বায় মিশে থাকলেও বহুবার হতাশায় ভেঙ্গে পড়েছিল। হয়ত আর পারলাম না। এমনটাও মনে হয়েছে। কিন্তু হাল ছাড়িনি। ১৯৯৪ সালের প্রথম দিকে ‘গোলাপগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ ধারাবাহিকভাবে সিলেটের বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশ করে আহবান করি সঠিক তথ্য সরবরাহ করে সংশোধনের জন্য। কিছু পেয়েছিলাম কিন্তু প্রয়োজনের চেয়ে নগন্য। অবশেষে বন্ধু-বান্ধব ও শুভানুধ্যায়ীর পরামর্শে পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসে। তাই ‘গোলাপগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ গ্রন্থ প্রকাশের আগে গোলাপগঞ্জের ইতিহাস, নামকরণ, কৃতি ব্যক্তিদের জীবনী, গোলাপগঞ্জের সাহিত্য সাধনা ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি নিয়ে ১৯৯৪ সালে ‘ক’জন কৃতিসন্তান’ গ্রন্থ প্রকাশ করি (মুখবদ্ধ; “ক’জন কৃতিসন্তান- আনোয়ার শাহজাহান)। বর্তমানে গোলাপগঞ্জের অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে উদ্ধার করে এ গ্রন্থে সন্নিবেশিত করার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করেছি। জানি না এ কাজ কতটুকু সার্থক হয়েছে। তবে গোলাপগঞ্জের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসের গ্রন্থ হিসাবে এ গ্রন্থটি মর্যাদাশীল করে তোলার লক্ষ্যে আমি চেষ্টার ত্র“টি করিনি। গোলাপগঞ্জকে আমার প্রাণের চেয়েও ভালোবাসি। গোলাপগঞ্জে জন্ম নিয়ে, গোলাপগঞ্জের মাটি, আলো, বাতাস সর্বোপরি মানুষের কাছে আমি চির ঋনী হয়ে আছি। এই ঋণ শোধ করার ক্ষমতা আমার নেই। তবে এই ক্ষুদ্র গ্রন্থটি রচনা করে আমি আমার গোলাপগঞ্জকে সমগ্র বাংলাদেশের মাঝে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠ করতে চাই। জানি না এ সার্থক কতটুকু বাস্তবতায় রূপ লাভ করবে। তিন. গোলাপগঞ্জ ইতিহাস ও ঐতিহ্য“গ্রন্থে নয়টি অধ্যায় রয়েছে, প্রথম অধ্যায়ে রয়েছে গোলাপগঞ্জের নামকরন ও পরিচিতি। গোলাপগঞ্জের নামকরন নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে অনেককে অনেক রকম অভিমত ব্যক্ত করতে দেখা গেছে। বিষটির সুষ্ঠু সুরাহাকল্পে আমি গোলাপগঞ্জ থানার ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষনা করে প্রথম গবেষনার ফসল “ক জন কৃতিসন্তান, গ্রন্থে গোলাপগঞ্জের নামকরন নিয়ে আলোচনা করি। বইটি প্রকাশের পর কেহ ভিন্ন মত পোষন করেননি গোলাপগঞ্জের নামকরন নিয়ে আশা করা যায় ভবিষ্যতে কোন প্রকার বিভ্রান্তিও সৃষ্টি হবে না ।দ্বিতীয় অধ্যায়ে রয়েছে গোলাপগঞ্জের সাহিত্য সাধনা। এতে আরবি ফারসী ও উর্দূ সাহিত্য থেকে আধুনিক সাহিত্য পর্যন্ত গোলাপগঞ্জবাসির সাহিত্য চর্চার বিবরন রয়েছে।তৃতীয় অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে গোলাপগঞ্জের রাজনৈতিক কর্মকান্ড।এতে সিপাহি বিল্পব থেকে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধে গোলাপগঞ্জবাসির সংগ্রামী ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছে। শেষাংশে বর্তমান কালের ক”জন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি রয়েছে।সপ্তম অধ্যায়ে প্রবাসী গোলাপগঞ্জবাসীর অবদান ও প্রবাসী গোলাপগঞ্জর লেখক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী, রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী ও কম্যুনিটি নেতৃবৃন্দেও সংক্ষিত পরিচিতি রয়েছে।এতে অনেকরই নাম বাদ পড়েছে।নবম অধ্যায়ে রয়েছে গোলাপগঞ্জের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের জীবনী, উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও এ উপজেলায় জন্ম নিয়েছেন আরও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। তথ্য ও যোগাযোগের অভাবে তাদের পরিচিতি সংগ্রহ করা যায়নি।এ ছাড়াও অন্যান্য অধ্যায়ে সংশ্লিষ্ট অনেকের নাম পরিচিতি ও কর্মকান্ড বাদ পড়েছে।এ জন্য দুঃখিত। এ গ্রন্থে আমি সমগ্র গোলাপগঞ্জের অতিতকে ইতিহাসের আসনে বসাতে চেয়েছি অত্যন্ত সাদরে।এখানে যদি কোন ত্র্ুটি পরিলক্ষিত হয়ে থাকে সে দোষ ইতিহাসের নহে, আমার।সব দোষ,সব দাবী এবং সমালোচকদের সকল প্রকার সমালোচনার জবাবে আমার সবিনয় নিবেদন থাকবে,এই গ্রন্থ প্রথম থেকে শেষ অবধি অধ্যয়নের পর আপনার সুচিন্তিত যে কোন প্রকার অবিমত প্রদান করলে তা সাদরে গৃহিত হবে এবং দ্বিতীয় সংস্করনে তা সংযোজিত হবে। চার. গোলাপগঞ্জের ইতিহাস সংগ্রহে যারা পরামর্শ,সহযোগিতা ও উৎসাহ দান করেছেন তাঁদের সকলের কাছে আমি কৃতজ্ঞতার পাশে রইলাম।এদেও মধ্যে ক‘জন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁরা হলেন,বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচায্য ও বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির সভাপতি কৃষি বিজ্ঞানী ডঃ এস ডি চৌধরী,দৈনিক খবর সম্পাদক ডঃমিজানুর রহমান মিজান,বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচায্য ডঃ মোছলেম উদ্দিন আহমদ চৌধরী,বাংলাদেশ রাইফেল্সÑএর সাবেক মহা পরিচালক মেজর জেনারেল (অবঃ) সফি আহমদ চৌধরী,নানকার আন্দোলনের প্রবক্তা ইসমাইল আলী, সাবেক সাংসদ ডঃ সৈয়দ মকবুল হোসেন,অধ্যক্ষ নীলোৎপল বড়–য়া, অধ্যাপক শ্রী রাধা বিনোদ মিশ্র, সাংবাদিক দেলোয়ার হোসেন দিলু, কবি মোঃ জিয়া উদ্দিন, চিএশিল্পী বাইস কাদির, মোঃ আবুল হাসনাত, সৈয়দ নাদির আহমদ, মোঃ ফয়ছল আহমদ ও আমার অনুজ সাংবাদিক মোঃ আনোয়ার মুরাদ ও আনোয়ার মাছুম। সর্বোপরি এ কাজে আমাকে প্রেরনা যুগিয়েছেন আমার পিতা আব্দুল মুুতলিব, মাতা আঞ্জুমান আরা বেগম,আমার অগ্রজ আনোয়ার আলেমগীর ও আনোয়ার জাহাঈীর। বইটি প্রকাশনার দায়িত্ব গ্রহন করেছেন বিলেত প্রবাসী মোঃ সুরাব আলি। এছাড়া রেডিও বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিয়মিত শিল্পী দিলরুবা চৌধরী. এ বই প্রকাশনায় সার্বিক সহযোগিতা প্রদান এবং মাসিক লন্ডন বিচিত্রা’র নির্বাহী সস্পাদক সাংবাদিক এস এম আশফাকুজ্জামান লিপন বইটি ছাপা সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ অত্যন্ত আন্তরিকতার সহিত সম্পন্ন করেছেন। যার জন্য তাদের কাছে ঋণী। এছাড়া আমার সহধর্মিনী বেগম নাসরীন শাহজাহান সহ আরো অনেকেই উৎসাহ ও পরামর্শ দিয়ে আমার এ শ্রমকে সহজ করে তুলেছেন।সকলের জন্য রইলো আমার শ্রদ্ধা-প্রীতি ভালোনাসা।
পাঁচ বিলেতে আসার পর প্রবাসী গোলাপগঞ্জবাসীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করি।এ উপলক্ষে যুক্তরাজ্যস্থ “গোলাপগঞ্জ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন”-এর উদ্যোগে বেশ কটি পরামর্শ সভা অনুষ্টিত হয়।এতে প্রবাসী গোলাপগঞ্জবাসীরা স্বতঃস্ফুর্তভাবে অংশ গ্রহন করেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-হাফিজ মজির উদ্দিন,শফিক উদ্দিন আহমদ,খন্দকার ফরিদ উদ্দিন,লোকমান উদ্দিন,কাউন্সিলার সাইফুল আলম,নূরুল ইসলাম,মুজিবুর রহমান,আব্দুল হাই,হাজি আব্দুল কাদির প্রমূখ।এছাড়া গীতিকার ও সাংবাদিক ফারুক আহমদ কবি আমান উদ্দিন, গীতিকার রুহল আমিন রুহেল,ফাহিমা আক্তার সাহেনা সহ আরো অনেকেই আমাকে সহযোগিতা করেছেন।গোলাপগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য গ্রন্থেও ভূমিকা লিখেছেন বিশিষ্ট গবেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ আসাদ্দর আলী এবং আমার পরিচিতি লিখে দিয়েছেন জাতীয় অধ্যাপক,উপমহাদেশের খ্যাতনামা সাহিত্যিক ,গবেষক ও দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ। আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। আমার দীর্ঘদিনের গবেষনার ফসল এ গ্রন্থটি অধ্যয়ন করে গোলাপগঞ্জের জনগন তথা পাঠকের হৃদয়ে যদি ঐতিহ্যপ্রীতি জাগ্রত হয় তবে আমার এ ত্যাগ ও কঠোর শ্রম সাধনা সার্থকতায় পর্যবসিত হবে। আমার এ প্রত্যাশ্যা রইলো গোলাপগঞ্জের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে। আনোয়ার শাহজাহান নভেমবর ১৯৯৬ |